৯ লা’খ টা’/কার বি’নিময়ে মা’নুষের জী’/বন কে’না-বেচা ল…see more

৯ লাখ টাকার বিনিময়ে মানুষের জীবন কেনা-বেচা—বারিধারার মীমের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনে নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীমের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র ২৪ বছর বয়সী মীম ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মেহেদী হাসান মীম নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ছিলেন এবং নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের জন্য উপার্জন করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

ঘটনার পর তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ৯ লাখ টাকার আপস-মীমাংসা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতের বাবা ও সৎ ভাইয়ের সঙ্গে গাড়ির মালিকপক্ষের ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে। আদালতসংক্রান্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে ওই অর্থ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে আপসের বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

তবে এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন—একজন মানুষের জীবনের মূল্য কি কখনো টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করা সম্ভব?

৯ লাখ টাকা একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য হয়তো অনেক বড় অর্থ। পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন মানুষকে হারানোর পর বাবা-মায়ের সামনে চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান ও ভবিষ্যতের নানা অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সেই বাস্তবতায় ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিবারটির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাওয়া আর একজন মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা—দুটি বিষয় এক নয়।

মীমের মৃত্যুর ঘটনায় ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে মীমকে চাপা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তী তদন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও বিশ্লেষণ করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সঙ্গে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে আইনের সংস্পর্শে আনা হয়েছে এবং আদালত তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। বিষয়টি এখনো তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ৯ লাখ টাকার আপসের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা সামনে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণে সম্মত হয়েছেন এবং আপসনামায় স্বাক্ষর করেছেন। আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের এ বিষয়ে আপত্তি থাকার কথাও সংবাদে এসেছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘৯ লাখ টাকায় একটি জীবন বিক্রি’—এই ভাষাটি মূলত ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া তীব্র সামাজিক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ। এটিকে সরাসরি আইনগতভাবে ‘জীবন কেনাবেচা’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায় না।

তবুও ঘটনাটি সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে—একজন দরিদ্র শ্রমিকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কি কোনো পক্ষ ন্যায়বিচার থেকে সরে যেতে বাধ্য হতে পারে?

একজন শ্রমিক হয়তো শহরের বড় বড় ভবনের মালিক নন, দামি গাড়িতে চলেন না, কিংবা সমাজের প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি নন। কিন্তু তাঁর জীবনও তাঁর পরিবারের কাছে অমূল্য। মীমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।

তিনি হয়তো নিজের জীবদ্দশায় পরিবারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের হাতে ৯ লাখ টাকা পৌঁছালেও সেই টাকা তাঁর বাবা-মায়ের কাছে তাঁদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

অর্থ দিয়ে চিকিৎসার খরচ মেটানো যায়, পরিবারের কিছুদিনের প্রয়োজন পূরণ করা যায় কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা নিরাপত্তা তৈরি করা যায়। কিন্তু একজন মানুষের অনুপস্থিতি পূরণ করা যায় না।

তাই বারিধারার এই ঘটনা শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা নয়; এটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ, আইনগত দায়, দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্ব এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও সামনে এনেছে।

মীমের মৃত্যুর প্রকৃত দায় কার, কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল এবং আইনের আওতায় শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে—তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখা দরকার—৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের অঙ্ক হতে পারে, কিন্তু কোনো মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য নয়।

Author: Barta Ghor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *