নবজাতক বেচা-কেনা নিয়ে চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের একটা প্রতিবেদন দেখলাম। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনে দেখানো হয় যে মাত্র চার লাখ টাকার বিনিময়েই পাওয়া যায় নবজাতক শিশু। অনুসন্ধানে এই চক্রের সাতজন সদস্যকেও আটক করা হয়। দেখে যা বুঝলাম এসব ইনফ্যান্টের সোর্সিং থেকে ক্রেতার হাতে পৌছে দেয়া, এগুলোর সবই নারীরা করে৷ এই চক্রটি নাকি সারা দেশ জুড়েই বিস্তৃত। অভিযোগ উঠেছে যে ডাক্তার, হাসপাতালের মালিক, কর্মচারীরা এই চক্রের সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত।
তবে চক্রের আটককৃত এই সদস্যকে দেখে খুব অবাক হলাম। তাকে দেখে বুঝার কোনো উপায়ই নাই যে তার মত মানুষ এরকম একটা নিকৃষ্টতম কাজের সঙ্গে জড়িত। একটা পুরোদস্তুর পরহেজগার ব্যক্তি, যাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়। না জানি কত বড় খোদাভীরু লোক সে! তার এই লেবাসকে আমি বিদ্রুপ করছি না। ধর্মীয় পোশাক পরা অপরাধ নয়, দাড়ি রাখা কিংবা টুপি পরাও কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। একজন মানুষ তার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন আমরা এসব বাহ্যিক পরিচয়কে সততা ও নৈতিকতার নিশ্চয়তা বা মাপকাঠি ভেবে নিই। বর্তমানে এমন কোনো কুকর্ম নাই লেবাসের আড়ালে হচ্ছেনা। লেবাসের পুরো ব্যাপারটাই তারা করে আমাদের চোখে ধুলো দেয়ার জন্যে।
এসব মানুষ দেখে আমরা প্রথমেই যেই ভুলটা করি সেটা হচ্ছে ধর্মীয় পরিচয়কে সম্মান করতে গিয়ে সেই পরিচয়ের কারণে যে কাউকেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখি। আমরা মনে মনে একরকম এটাই ভাবি যে এমন মানুষকে সন্দেহ করলেও বোধহয় পাপ হবে। কিন্তু ধর্মীয় কারোর পরিচয়কে সম্মান করা আর সেই পরিচয়ের কারণে কাউকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা এক বিষয় নয়। এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা এই লোকটা একটা দুধের শিশুকে অর্থের বিনিময়ে কেনাবেচার কাজ করতে পারে।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে ধর্মীয় লেবাস অনেক সময় এমন এক ধরনের অঘোষিত বিশ্বাসযোগ্যতার সনদ হয়ে দাঁড়ায়, যার সামনে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়। আমরা ভাবি, টুপি পরা মানুষটি নিশ্চয়ই সৎ, লম্বা দাড়িওয়ালা লোকটি নিশ্চয়ই খোদাভীরু, ধর্মীয় কথা বলা ব্যক্তিটি নিশ্চয়ই অন্যায় করতে পারেন না। আর এই মানসিকতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিজেদের এমন এক বিশ্বাসযোগ্য আবরণে ঢেকে ফেলতে পারেন, যার আড়ালে তাঁদের প্রকৃত আচরণ যাচাই করার প্রয়োজনই আমরা অনুভব করি না।
আবারো বলছি আমি তার লেবাসকে বিদ্রুপ করছি না। আমি যেটা বলছি ধর্মীয় পরিচয়ে একজন মানুষের বিশ্বাসের প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু সেটা তার নৈতিকতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আর সমস্যাটা সরাসরি ধর্মীয় লেবাসে না থাকলেও সেগুলো ঘুরেফিরে ঐ লেবাসেই ভিতরে গিয়ে ধরা পড়ে৷ তারছাড়া তারচেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছেলেবাসকেই সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতায়।
কাজেই কাউকে অন্ধবিশ্বাস করবেন না। বিশেষ করে এমন লোকদের আরো না। প্রশ্ন করুন, প্রমাণ খুঁজুন। মানুষকে তার পরিচয়ে নয়, তার কাজে বিচার করুন। নবজাতকের মতো এমন অসহায় শিশুর নিরাপত্তা কিংবা যেকোনো মানুষের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে লেবাস যেন সত্য অনুসন্ধানের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়