অবশেষে সাঈদীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসককে গ্রেপ্তার—ভাইরাল দাবির পেছনে আসল ঘটনা কী?
জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর তাঁর চিকিৎসা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে একটি দাবিতে বলা হয়, সাঈদীকে হত্যার দায়ে তাঁর চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন যাচাই করে এই দাবির সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল পাওয়া যায় না।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাঈদীর চিকিৎসা করা চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামানকে সাঈদীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং সাঈদীর মৃত্যুর পর ওই চিকিৎসক নিজেই প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগে পুলিশের কাছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়া হয়। সেখানে হৃদ্রোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক চৌধুরী মেশকাত আহমেদের তত্ত্বাবধানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৪ আগস্ট রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
সাঈদীর চিকিৎসায় থাকা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের একজন ছিলেন অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি চিকিৎসক হিসেবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু সাঈদীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা শুরু হয়। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগমাধ্যমেও ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি আসতে থাকে বলে তিনি পুলিশকে জানান।
এরপর ১৫ আগস্ট রাতে ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ডা. মোস্তফা জামান। সেখানে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
তদন্তের পর ওই চিকিৎসককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের একজনকে উত্তরা থেকে এবং অন্যজনকে ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে আটক করা হয়েছিল। পরে এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, আটক তাফসিরুল ইসলাম চিকিৎসককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে আটক হন। র্যাবের দাবি অনুযায়ী, তাঁর মোবাইলে হুমকির বার্তার স্ক্রিনশটও পাওয়া গিয়েছিল।
অর্থাৎ এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। সাঈদীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসককে হত্যাকারী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল—এমন তথ্য পাওয়া যায় না। বরং সাঈদীর মৃত্যুর পর চিকিৎসক নিজেই হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন এবং তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
সাঈদীর মৃত্যুর কারণ নিয়েও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়েছিল। তবে হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সাঈদীকে হত্যা করার কোনো আদালত-স্বীকৃত অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সাঈদীর রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাস আলাদা একটি বিষয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল; পরে ২০১৪ সালে আপিল বিভাগ সেই সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়। ২০২৩ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া “সাঈদীকে হত্যার দায়ে ডাক্তার গ্রেপ্তার” শিরোনামটি বিভ্রান্তিকর। যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, সাঈদীর চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়নি; বরং তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো অভিযোগ ও তাঁকে দেওয়া প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়েছিল।
সাঈদীর মৃত্যুকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে নানা দাবি ও পাল্টা দাবি সামনে এলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আদালতের নথি