৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে না পারলে ১ জানুয়ারি থেকে কী হতে পারে?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছেন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি দেশে ফিরতে না পারলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—এমন আলোচনা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এর আগে তাঁর মুখপাত্রও জানিয়েছিলেন, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ তখন জানানো হয়নি।
পরবর্তীতে আগস্টেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে তিনি জনগণের কাছে যাওয়ার এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি রাখছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাবর্তন বাস্তবে কীভাবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলা ও আদালতের রায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার কথা বলা হয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি দেশে ফিরে মামলাগুলোর মুখোমুখি হলে সরকার তাঁকে স্বাগত জানাবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে সরকারের কয়েকজন সদস্য আরও কঠোর অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আগস্টে বলেন, শেখ হাসিনা সাজা ভোগ না করে দেশে ফিরতে পারবেন না—এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে না পারলে কী হবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে এটিকে ১ জানুয়ারি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এমন কোনো সরকারি বা দলীয় সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। বরং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি দেশে না ফিরলে তাঁর পরবর্তী বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের ওপর নেতাকর্মীদের আস্থার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত সময়সূচিতে পরিণত হয়নি। তিনি ডিসেম্বরের কথা বলেছেন, কিন্তু নির্দিষ্ট দিন, যাত্রাপথ বা ফেরার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি এখনো সামনে আসেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজও সাম্প্রতিক এক আলোচনায় বলেছেন, তাঁর দেশে ফেরা বা না ফেরার বিষয়টি এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন এবং দলটি ভবিষ্যতে কী রাজনৈতিক অবস্থান নেবে—এসব প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি; এখনই কোনো একটি ফলাফল নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন করে গতি পেতে পারে। আবার তাঁর দেশে ফেরার বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসবে, তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে না পারলে ১ জানুয়ারি থেকেই তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে তাঁর ঘোষিত সময়সীমা পার হয়ে গেলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। আর তিনি দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কী আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতির ওপর।