রমজানের আগেই ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্র’স্তাব দিয়েছেন ব্য’/বসায়ীরা… more

# রমজানের আগেই ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার

**নিজস্ব প্রতিবেদক:** পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে তাঁরা এ প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে ব্যবসায়ীদের এই প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। ফলে রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়বে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি প্রস্তুতি এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। আসন্ন রমজানে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ২৭ অক্টোবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

## কেন ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব?

ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ও সরবরাহের ব্যয় বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান দামে ভোজ্যতেল বিক্রি করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা ব্যয়ের চাপের মুখে পড়ছেন বলে তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এ কারণে প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত কারণ এবং প্রকৃত আমদানি ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোজ্যতেল বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অন্যতম প্রধান উপকরণ। এ পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পরিবারের মাসিক বাজার খরচে পড়তে পারে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রস্তাবটি বিবেচনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

## রমজানের আগে বাড়তি খরচের আশঙ্কা

রমজান মাসে ইফতারের বিভিন্ন খাবার তৈরি করতে সয়াবিন ও পাম তেলের ব্যবহার বেড়ে যায়। পেঁয়াজু, বেগুনি, ডালের বড়া, আলুর চপসহ নানা ধরনের ভাজাপোড়া তৈরিতে ভোজ্যতেল প্রয়োজন হয়। ফলে এ সময়ে বাজারে তেলের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় বাড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সাধারণ ক্রেতাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে। প্রতিদিনের রান্না থেকে শুরু করে ইফতারের খাবার তৈরি—সব ক্ষেত্রেই তেলের ব্যবহার থাকায় সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অনেক পরিবারের ওপর পড়তে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, **দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সরকার এখনো তা অনুমোদন করেনি।** তাই প্রস্তাবের খবরকে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

## রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রস্তুতি

বৈঠকে শুধু ভোজ্যতেল নয়, রমজানে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাজারে যাতে পণ্যের সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সময়মতো আমদানি এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন।

একই সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ৮ লাখ ৫ হাজার টনের ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, রমজানের আগেই বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমদানির কার্যক্রম চলছে। তবে শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়লেই বাজারদর কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই; আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ।

## খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের দাবি

বৈঠকে খেজুর আমদানিকারকেরাও তাঁদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমানে খেজুর আমদানিতে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানিসংক্রান্ত কিছু জটিলতা যুক্ত হওয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

আমদানিকারকেরা খেজুরের প্রকৃত মান ও দামের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিভিন্ন মান ও দামের খেজুরের ক্ষেত্রে একই ধরনের শুল্কায়নমূল্য প্রয়োগ করলে সাধারণ মানের খেজুর আমদানির খরচও বেড়ে যেতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করে দেখার কথা জানিয়েছে। রমজানে খেজুরের চাহিদা বাড়ে বলে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে। তবে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব এবং চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

## ছোলা, ডাল ও চিনির আমদানিও বেড়েছে

রমজানের ইফতার ও সাহ্‌রিতে ছোলা, মসুর ডাল, চিনি এবং খেজুরের ব্যবহার বেড়ে যায়। এ কারণে এসব পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা বাজার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১২ হাজার টন। অন্যদিকে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি।

এ সময়ে চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। খেজুর আমদানিও বেড়েছে—চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার টন।

সরকারের লক্ষ্য, রমজানে চাহিদা বাড়ার আগেই প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে বাজারে এসব পণ্য পর্যাপ্ত থাকলেও ভোক্তারা যেন যৌক্তিক দামে কিনতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

## সাধারণ ক্রেতাদের প্রত্যাশা কী?

রমজানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ নতুন নয়। এ সময় পরিবারের বাজার খরচ বেড়ে যায়। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলা, খেজুরসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে অনেক পরিবারকে বাজেট সমন্বয় করতে হয়।

এমন অবস্থায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ভোক্তাদের প্রত্যাশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় প্রকৃত আমদানি ব্যয়, বাজারে মজুত, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করবে।

একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, অবৈধ মজুতদারি কিংবা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে তার কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।

## এখন কী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত। ব্যবসায়ীরা প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও ২৬ অক্টোবরের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

তাই নতুন কোনো সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধিকে কার্যকর সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ঘোষণা এবং বাজারের বাস্তব পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দামে পরিবর্তন আসবে কি না।

**সব মিলিয়ে, রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন সাধারণ ক্রেতাদের নজর সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে—দাম বাড়বে, নাকি সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব হবে।**

Author: Barta Ghor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *